বাংলার ইতিহাসঃ আলেকজান্ডার থেকে শশাঙ্ক থেকে বঙ্গবন্ধু

বাংলার ইতিহাসঃ আলেকজান্ডার থেকে শশাঙ্ক থেকে বঙ্গবন্ধু

The Complete History of Bangladesh. Alexander to Shawshank to Bangabandhu.

বিম্বিসারঅজাতশত্রুমৌর্য সাম্রাজ্য – গৌড় রাজ্য – মাৎস্যন্যায় – পাল রাজবংশ সেন রাজবংশ – ইলিয়াস শাহী বংশ – বায়াজিদ বংশ – গণেশ বংশ – ইলিয়াস শাহী বংশ (দ্বিতীয়) – হাবসি বংশ – হুসেন বংশ – শূর বংশ – কররানি বংশ – মুঘল আমল – ইংরেজ শাসন – দেশ বিভাজন – স্বাধীনতা যুদ্ধ

বাংলার ইতিহাস

বাংলার ইতিহাস বলতে অধুনা বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিগত চার সহস্রাব্দের ইতিহাসকে বোঝায়। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদ এক অর্থে বাংলাকে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের ইতিহাসে বাংলা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। প্রাচীন রোমান ও গ্রীকদের কাছে এই অঞ্চল গঙ্গারিড নামে পরিচিত ছিল। প্রায় চার হাজার বছরের পুরনো তাম্রযুগের ধ্বংসাবশেষ বাংলায় পাওয়া গেছে।
ইন্দো-আর্যদের আসার পর অঙ্গ, বঙ্গ এবং মগধ রাজ্য গঠিত হয় খ্রীষ্টপূর্ব দশম শতকে। এই রাজ্যগুলি বাংলা এবং বাংলার আশেপাশে স্থাপিত হয়েছিল। অঙ্গ বঙ্গ এবং মগধ রাজ্যের বর্ণনা প্রথম পাওয়া যায় অথর্ববেদে প্রায় ১০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে।
খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে বাংলার বেশিরভাগ এলাকাই শক্তিশালী রাজ্য মগধের অংশ ছিল। মগধ ছিল একটি প্রাচীন ইন্দো-আর্য রাজ্য। মগধের কথা রামায়ণ এবং মহাভারতে পাওয়া যায়। বুদ্ধের সময়ে এটি ছিল ভারতের চারটি প্রধান রাজ্যের মধ্যে একটি। মগধের ক্ষমতা বাড়ে বিম্বিসারের (রাজত্বকাল ৫৪৪-৪৯১ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ) এবং তার ছেলে অজাতশত্রুর (রাজত্বকাল ৪৯১-৪৬০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ) আমলে। বিহার এবং বাংলার অধিকাংশ জায়গাই মগধের ভিতরে ছিল ।
৩২৬ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সেনাবাহিনী মগধের নন্দ সাম্রাজ্যের সীমানার দিকে অগ্রসর হয়। এই সেনাবাহিনী ক্লান্ত ছিল এবং গঙ্গা নদীর কাছাকাছি বিশাল ভারতীয় বাহিনীর মুখোমুখি হতে ভয় পেয়ে যায়। এই বাহিনী বিয়াসের কাছে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং আরও পূর্বদিকে যেতে অস্বীকার করে। আলেকজান্ডার তখন তার সহকারী কইনাস (Coenus) এর সাথে দেখা করার পরে ঠিক করেন ফিরে যাওয়াই ভাল।

CHAPTER 1 মৌর্য সাম্রাজ্য

মৌর্য সাম্রাজ্য (রাজত্বকাল ৩২১-১৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) মগধেই গড়ে উঠেছিল। মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। এই সাম্রাজ্য অশোকের রাজত্বকালে দক্ষিণ এশিয়া, পারস্য, আফগানিস্তান অবধি বিস্তার লাভ করেছিল। পরবর্তীকালে শক্তিশালী গুপ্ত সাম্রাজ্য মগধেই গড়ে ওঠে যা ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরাংশে এবং পারস্য এবং আফগানিস্তানের কিছু অংশে বিস্তার লাভ করেছিল। চন্দ্রগুপ্ত —> বিন্দুসার —> অশোক।

CHAPTER 2 গৌড় রাজ্য

বাংলা অঞ্চলের প্রথম স্বাধীন রাজা ছিলেন রাজা শশাঙ্ক যিনি ৬০৩ থেকে ৬৩৭ সাল পর্যন্ত আমৃত্যু বাংলাকে শাষন করেছেন। তার সাম্রাজ্যের বিসতৃতির সঠিক ধারণা পাওয়া না গেলেও প্রাচীন বাংলা বলতে আমরা বুঝি পশ্চিম বঙ্গ যা আজকের কালকাতা আর আসাম, ত্রিপুরার কিছু অঞ্চল, বিহার, উডিস্যা ও পূর্ববাংলা তথা আজকের বাংলাদেশ যা তখন গৌড় বলে পরিচিত ছিল। ব্রিটিশ শাষনামলে বাংলাভাষী অঞ্চল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি নামে পরিচিত ছিল। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় বসেন তাঁর পুত্র মানব, যিনি ৮ মাস পর্যন্ত গৌড়ের শাসনকার্য চালান। তার কিছুকাল পরই গৌড়, সম্রাট হর্ষবর্ধণ এবং কামরূপের রাজা ভাস্কর বর্মণ কর্তৃক দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। শশাঙ্কের মৃত্যুর সাথে সাথে তার রাজবংশের পতন ঘটে এবং বাংলায় শুরু হয় এক অরাজক পরিবেশ যা ইতিহাসে মাৎস্যন্যায় নামে পরিচিত।

CHAPTER 3 মাৎস্যন্যায় বা বাংলার অরাজক অবস্থা

গৌড় শাষক শশাংকের মৃত্যুর পর বা তার রাজ বংশের পতনের পর বাংলায় আর কোন কেন্দ্রেীয় শাষক ছিলেন না। সমগ্র বঙ্গে বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছোট ছোট রাজ্যের সৃষ্টি হল যা শাষন করত কিছু অত্যাচারি দুর্বল শাষক। বঙ্গের জনগনের উপর নেমে এসেছিল সীমাহীন দুঃখ দুর্দশা। জোর যার মুল্লুক তার এই নীতিতে দেশ চলছিল। যে বা যারা জোর খাটাতে পারত সেই ছিল সেখানকার অধিপতি। অভিভাবকহীন সন্তান যেমন বেপরোয়া চলে, যা ইচ্ছা তাই করে বেড়ায় ঠিক তেমনি বাংলার জনগনও অভিবাবকহীন হয়ে যে যার মত করে চলতে লাগল যা ইতিহাসে মাৎস্যন্যায় বলে পরিচিত। মাৎস্যন্যায়ের স্থায়ীত্বকাল ছিল ১৫০ বছর বা ৭৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।

CHAPTER 4 পাল রাজবংশ

মাৎস্যন্যায় সময়ের ভয়বহতা উপলব্ধি করে বাংলার জনগন গোপাল নামক এক সামন্ত রাজাকে নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের রাজা হিসেবে গ্রহণ করেন। সেই থেকে শুরু হয় পাল রাজবংশের। গোপালই পাল রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। গোপাল রাজ বংশের শক্তিশালি দুই রাজা ছিলেন যথক্রমে ধর্মপাল (রাজত্বকাল ৭৮১-৮২১ খ্রীষ্টাব্দ) এবং দেবপাল (রাজত্বকাল ৮২১-৮৬১ খ্রিষ্টাব্দ)। পাল বংশের স্থায়ীত্বকাল ছিল প্রায় ৪০০ বছর।

  1. প্রথম গোপাল (৭৫৬-৭৮১)
  2. ধর্মপাল (৭৮১-৮২১)
  3. দেবপাল (৮২১-৮৬১)
  4. প্রথম বিগ্রহপাল, মহেন্দ্রপাল ও প্রথম শূরপাল (৮৬১-৮৬৬)
  5. নারায়নপাল (৮৬৬-৯২০)
  6. রাজ্যপাল (৯২০-৯৫২)
  7. দ্বিতীয় গোপাল (৯৫২-৯৬৯)
  8. দ্বিতীয় বিগ্রহপাল (৯৬৯-৯৯৫)
  9. প্রথম মহীপাল (৯৯৫-১০৪৩)
  10. নয়াপাল (১০৪৩-১০৫৮)
  11. তৃতীয় বিগ্রহপাল (১০৫৮-১০৭৫)
  12. দ্বিতীয় মহীপাল (১০৭৫-১০৮০)
  13. দ্বিতীয় শূরপাল (১০৭৫-১০৭৭)
  14. রামপাল (১০৮২-১১২৪)
  15. কুমারপাল (১১২৪-১১২৯)
  16. তৃতীয় গোপাল (১১২৯-১১৪৩)
  17. মদনপাল (১১৪৩-১১৬২)

CHAPTER 5 সেন রাজবংশ

পাল রাজবংশের রাজা দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে বারেন্দ্র ‘সামন্তচক্রের’ বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেন পশ্চিমবঙ্গে ক্রমশ স্বীয় আধিপত্য বিস্তার করেন এবং অবশেষে বাংলার পাল রাজবংশের রাজা মদনপালের রাজত্বকালে স্বাধীন সত্ত্বার বিকাশ ঘটান। বাংলায় সেন শাসনের বিশেষ তাৎপর্য এই যে, সেনগণই সর্বপ্রথম সমগ্র বাংলার ওপর তাদের নিরঙ্কুশ শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে বাংলার সেন বংশীয় রাজাদের মধ্যে বিজয় সেন, বল্লাল সেন, ও লক্ষ্মণ সেন বিশিষ্ট স্থান অধিকার করছেন। সেন রাজবংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেন হলেও মূল রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন সামন্ত সেন ও হেমন্ত সেন। পরে হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেনই সেন রাজবংশের বিস্তিৃতি ঘটান। অবশেষে বাংলার সর্বশেষ স্বাধীন রাজা ছিলেন সেন বংশেরেই লক্ষন সেন। এর পরই বাংলায় শুরু হয় মুসলিম শাষন।

  1. হেমন্ত সেন (১০৯৭)
  2. বিজয় সেন (১০৯৭-১১৬০)
  3. বল্লাল সেন (১১৬০-১১৭৮)
  4. লক্ষ্মন সেন (১১৭৮-১২০৬)
  5. বিশ্বরূপ সেন (১২০৬-১২২০)
  6. কেশব সেন (১২২০-১২৫০)

CHAPTER 6 মুসলিম শাসন

ভারতীয় উপমহাদেশে ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাশিমের সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে মুসলিম শাসনের শুরু হলেও বাংলায় মুসলিম শাসন আসে ১২০৪ সালে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির হাত ধরে। তিনিই প্রথম ১৭ মতান্তরে ১৮ জন ঘোড় সওয়ারী সৈন্য নিয়ে তখনকার বাংলার রাজধানী নদীয়া আক্রমণ করে রাজা লক্ষণ সেনকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে ও এ দেশে মুসলিম শাসনের পথ সুগম করেন। প্রায় ৬০০ বছরের কাছাকাছি সময় অর্থাৎ ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত এ দেশে মুসলিম শাষন অব্যাহত ছিল।

6.1 ইলিয়াস শাহী বংশ (প্রথম পর্ব)

  1. শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৩৫৮) (১৩৪২ থেকে পশ্চিম বাংলার লখনৌতি রাজ্যের সুলতান এবং ১৩৫২ থেকে পুরো বাংলায়)
  2. প্রথম সিকান্দর শাহ (১৩৫৮-১৩৯০)
  3. গিয়াসুদ্দীন আজম শাহ (১৩৯০-১৪১১)
  4. সাইফুদ্দীন হামজা শাহ (১৪১১-১৪১৩)
  5. মুহাম্মদ শাহ (১৪১৩)

6.2 বায়াজিদ বংশ

  1. শিহাবুদ্দিন বায়াজিদ শাহ (১৪১৩-১৪১৪)
  2. প্রথম আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ (১৪১৪-১৪১৫)

6.3 গণেশ বংশ

  1. রাজা গণেশ (১৪১৪-১৪১৫ এবং ১৪১৬-১৪১৮)
  2. জালালুদ্দীন মুহাম্মদ শাহ (১৪১৫-১৪১৬ এবং ১৪১৮-১৪৩৩)
  3. শামসুদ্দীন আহমদ শাহ (১৪৩৩-১৪৩৫)

6.4 ইলিয়াস শাহী বংশ (দ্বিতীয় পর্ব)

  1. প্রথম নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৪৩৫-১৪৫৯)
  2. রুকনুদ্দীন বারবক শাহ (১৪৫৯-১৪৭৪)
  3. শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-১৪৮১)
  4. দ্বিতীয় সিকান্দর শাহ (১৪৮১)
  5. জালালুদ্দীন ফতেহ শাহ (১৪৮১-১৪৮৭)

6.5 হাবসি বংশ

  1. বারবক শাহ (১৪৮৭)
  2. সাইফুদ্দীন ফিরোজ শাহ (১৪৮৭-১৪৯০)
  3. দ্বিতীয় নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৪৯০)
  4. শামসুদ্দীন মুজাফ্ফর শাহ (১৪৯০-১৪৯৩)

6.6 হুসেন বংশ

  1. আলাউদ্দিন হুসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯)
  2. নাসিরুদ্দীন নুসরত শাহ (১৫১৯-১৫৩২)
  3. দ্বিতীয় আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ (১৫৩২-১৫৩৩)
  4. গিয়াসুদ্দীন মাহমুদ শাহ (১৫৩৩-১৫৩৮)

6.7 শূর বংশ

  1. শের শাহ শূরি (১৫৪০-১৫৪৫)
  2. ইসলাম শাহ শূরি (১৫৪৫-১৫৫৩)
  3. ফিরোজ শাহ শূরি (১৫৫৩)
  4. আদিল শাহ শূরি (১৫৫৩-১৫৫৭)- তাঁর শাসনকালে ১৫৫৫ সালে বাংলার শাসক মুহাম্মদ খান শূরি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং ‘শামসুদ্দীন মুহাম্মদ শাহ’ উপাধী ধারণ করে বাংলার সিংহাসনে বসেন।
  5. শামসুদ্দীন মুহাম্মদ শাহ (১৫৫৫)
  6. প্রথম গিয়াসুদ্দীন বাহাদুর শাহ (১৫৫৫-১৫৬০)
  7. গিয়াসুদ্দীন জালাল শাহ (১৫৬০-১৫৬২)
  8. দ্বিতীয় গিয়াসুদ্দীন বাহাদুর শাহ (১৫৬২-১৫৬৩)

6.8 কররানি বংশ

  1. তাজ খান কররানি (১৫৬৩)
  2. সুলায়মান কররানি (১৫৬৩-১৫৭২)
  3. বায়াজিদ কররানি (১৫৭২-১৫৭৩)
  4. দাউদ খান কররানি (১৫৭৩-১৫৭৬)

6.9 মুঘল আমল(১৫২৬-১৮৫৭)

পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইবরাহিম লোদির বিরুদ্ধে বাবরের জয়ের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের সূচনা হয়। মুঘল সম্রাটরা ছিলেন মধ্য এশিয়ার তুর্কো-মঙ্গোল বংশোদ্ভূত। তারা চাগতাই খান ও তৈমুরের মাধ্যমে চেঙ্গিস খানের বংশধর। ১৫৫৬ সালে আকবরের ক্ষমতারোহণের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের ধ্রূপদী যুগ শুরু হয়। আকবর ও তার ছেলে জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ভারতে অর্থনৈতিক প্রগতি বহুদূর অগ্রসর হয়। আকবর অনেক হিন্দু রাজপুত রাজ্যের সাথে মিত্রতা করেন। কিছু রাজপুত রাজ্য উত্তর পশ্চিম ভারতে মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জারি রাখে কিন্তু আকবর তাদের বশীভূত করতে সক্ষম হন। মুঘল সম্রাটরা মুসলিম ছিলেন তবে জীবনের শেষের দিকে শুধুমাত্র সম্রাট আকবর ও তার পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীর নতুন ধর্ম দীন-ই-ইলাহির অনুসরণ করতেন।

শাহজাহানের যুগে মুঘল স্থাপত্য এর স্বর্ণযুগে প্রবেশ করে। তিনি অনেক স্মৃতিসৌধ, মসজিদ, দুর্গ নির্মাণ করেন যার মধ্যে রয়েছে আগ্রার তাজমহল, মোতি মসজিদ, লালকেল্লা, দিল্লি জামে মসজিদ। আওরঙ্গজেবের শাসনামলে মুঘল সাম্রাজ্যের সীমানা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছায়। শিবাজী ভোসলের অধীনে মারাঠাদের আক্রমণের ফলে সাম্রাজ্যের অবনতি শুরু হয়। আওরঙ্গজেবের সময় দক্ষিণ ভারত জয়ের মাধ্যমে ৩.২ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটারের বেশি অঞ্চল মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয়। এসময় সাম্রাজ্যের জনসংখ্যা ছিল ১৫০ মিলিয়নের বেশি যা তৎকালীন পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ এবং জিডিপি ছিল ৯০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

১৮শ শতাব্দীর মধ্যভাগ নাগাদ মারাঠারা মুঘল সেনাবাহিনীর বিপক্ষে সফলতা লাভ করে এবং দক্ষিণাত্য থেকে বাংলা পর্যন্ত বেশ কিছু মুঘল প্রদেশে বিজয়ী হয়। সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার দুর্বলতার কারণে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সৃষ্টি হয় যার ফলে বিভিন্ন প্রদেশ কার্যত স্বাধীন হয়ে পড়ে। ১৭৩৯ সালে কারনালের যুদ্ধে নাদির শাহের বাহিনীর কাছে মুঘলরা পরাজিত হয়। এসময় দিল্লি লুন্ঠিত হয়। পরের শতাব্দীতে মুঘল শক্তি ক্রমান্বয়ে সীমিত হয়ে পড়ে এবং শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের কর্তৃত্ব শুধু শাহজাহানাবাদ শহরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সিপাহী বিদ্রোহের সমর্থনে তিনি একটি ফরমান জারি করেছিলেন। সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার বিরুদ্ধে রাজদ্রোহীতার অভিযোগ এনে কারাবন্দী করে। শেষে তিনি রেঙ্গুনে নির্বাসিত হন এবং সেখানেই মারা যান।

  1. জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর (1526-1530)
  2. নাসিরউদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ুন (1530-1556)
  3. আকবর-এ-আজম জালালউদ্দিন মুহাম্মদ (1556-1605)
  4. জাহাঙ্গীর নুরউদ্দিন মুহাম্মদ সেলিম (1605-1627)
  5. শাহজাহান শাহাবউদিন মুহাম্মদ খুররম (1627-1658)
  6. আলমগীর মুহিউদ্দিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব (1658-1707)
  7. আবুল ফাইজ কুতুবউদ্দিন মুহাম্মদ আজম হ (1707-1707)
  8. বাহাদুর শাহ কুতুবউদ্দিন মুহাম্মদ মুয়াজ্জম (1707-1712)
  9. মাআজউদ্দিন জাহানদার শাহ বাহাদুর (1712-1713)
  10. ফর‌রুখসিয়ার (1713-1719)
  11. রাফি উল-দারজাত (1719-1719)
  12. দ্বিতীয় শাহজাহান রাফি উদ-দৌলত (1719-1719)
  13. মুহাম্মদ শাহ রোশান আখতার বাহাদুর (1719-1748)
  14. আহমেদ শাহ বাহাদুর (1748-1753)
  15. দ্বিতীয় আলমগীর আজিজউদ্দিন (1754-1759)
  16. তৃতীয় শাহজাহান মুহিউল মিল্লাত (1759-1760)
  17. দ্বিতীয় শাহ আলম আলি গওহর (1759-1806)
  18. দ্বিতীয় আকবর শাহ মির্জা আকবর (1806-1837)
  19. আবু জাফর সিরাজউদ্দিন মুহাম্মদ বাহাদুর শাহ জাফর (1837-1857)

বাংলার নবাব

  1. মুর্শিদকুলি জাফর খান ১৭০৩-১৭২৭
  2. সুজা উদ্দিন ১৭২৭-১৭৩৯
  3. সফররাজ খান ১৭৩৯-১৭৪০
  4. আলিবর্দী খান ১৭৪০-১৭৫৬
  5. সিরাজদ্দৌলা ১৭৫৬-১৭৫৭

CHAPTER 7 ইংরেজ শাসন

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন পলাশির আম বাগানে ভগিরতি নদীর তীরে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দোলার মৃত্যুর মাধ্যমে এ দেশে ইংরেজ শাসনের উন্মেষ হলো। মীর জাফরের মীর জাফরীর কারণে বাংলা তথা পুরো ভারতবর্ষ হারালো তাঁর স্বাধীনতা।

  1. মীরজাফর ১৭৫৭-১৭৬০
  2. মীরকাসিম ১৭৬০-১৭৬৩
  3. মীরজাফর (দ্বিতীয় বার) ১৭৬৩-১৭৬৫
  4. নাজম উদ দৌলা ১৭৬৫-১৭৬৬
  5. সইফ উদ দৌলা ১৭৬৬-১৭৭০

ব্রিটিশ শাসনের সময়ে দুটি মারাত্মক দুর্ভিক্ষ বা মন্বন্তর বহুমানুষের জীবনহানি ঘটিয়েছিল। প্রথম দুর্ভিক্ষটি ঘটেছিল ১৭৭০ খ্রীষ্টাব্দে এবং দ্বিতীয়টি ঘটেছিল ১৯৪৩ খ্রীষ্টাব্দে। ১৭৭০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্বকালে বাংলার দুর্ভিক্ষটি ছিল ইতিহাসের সব থেকে বড় দুর্ভিক্ষগুলির মধ্যে একটি। বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল ১৭৭০ এবং তার পরবর্তী বছরগুলিতে।

অবিভক্ত ভারতের বাংলা অঞ্চলে, ১৯ শতক জুড়ে এবং ২০ শতকের প্রথমার্ধে সমাজ সংস্কার আন্দোলনই বাংলার নবজাগরণ নামে পরিচিত। রাজা রামমোহন রায়ের (১৭৭২ –১৮৩৩) হাত ধরে ১৯ শতকে এ নবজাগরণের সূচনা। ২০ এর শতকের মধ্যমাংশে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে অবসান ঘটে এ নবজাগরণের। অসংখ্য সাহিত্যিক , বিজ্ঞানী, সাংবাদিক ও দেশপ্রেমিকের হাত ধরে বাংলার নবজাগরণ বাংলাকে উত্তরণ করে মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে।
১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের সিপাহি বিদ্রোহ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির শাসনের অবসান ঘটায় এবং বাংলা সরাসরি ভাবে ব্রিটিশ রাজবংশের শাসনাধীনে আসে।

  1. ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৭৩–১৭৮৫): ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৬৯-৭৩), রোহিলা যুদ্ধ (১৭৭৩-৭৪), প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ (১৭৭৩-৮৩), চালিসা মন্বন্তর (১৭৮৩-৮৪), দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৮০-৮৪)
  2. চার্লস কর্নওয়ালিস (১৭৮৬– ১৭৯৩): চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৮৯-৯২), দোজি বরা মন্বন্তর (১৭৯১-৯২)
  3. জন শোর (১৭৯৩–১৭৯৮): ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আর্মি পুনর্গঠিত হয় এবং এর ব্যয়সংকোচ করা হয়।
  4. রিচার্ড ওয়েলেসলি (১৭৯৮–১৮০৫): চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৯৮-৯৯), দ্বিতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ (১৮০৩-০৫)
  5. চার্লস কর্নওয়ালিস (দ্বিতীয়বার) (১৮০৫–১৮০৫): ব্যয়বহুল যুদ্ধাভিযানের পর কোম্পানিতে আর্থিক চাপ, শান্তি স্থাপনের প্রচেষ্টায় কর্নওয়ালিসকে পুনর্বহাল করা হয়। কিন্তু তিনি গাজিপুরে মারা যান।
  6. জর্জ হিলারিও বার্লো (অস্থায়ী) (১৮০৫–১৮০৭): ভেলোর বিদ্রোহ (১০ জুলাই, ১৮০৬)
  7. লর্ড মিন্টো (১৮০৭ –১৮১৩): জাভা আক্রমণ, মরিশাস দখল
  8. মার্কুইস অফ হেস্টিংস (১৮১৩ –১৮২৩): ১৮১৪ সালে ইঙ্গ-নেপাল যুদ্ধ, কুমায়ুন, গাড়ওয়াল ও পূর্ব সিক্কিম অধিগ্রহণ, তৃতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ (১৮১৭-১৮১৮), রাজপুতানা রাজ্যসমূহ ব্রিটিশ আধিপত্য স্বীকার করে নেয় (১৮১৭)
  9. লর্ড আমহার্স্ট (১৮২৩–১৮২৮): প্রথম ইঙ্গ-ব্রহ্ম যুদ্ধ (১৮২৩-২৬), আসাম, মণিপুর এবং ব্রহ্মদেশের থেকে আরাকান ও টেনাসেরিম অধিগ্রহণ
  10. উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক (১৮২৮–১৮৩৫): সতীদাহ প্রথা#ব্রিটিশ ও অন্যান্য ইউরোপীয় উপনিবেশে সতীদাহ প্রথা রদ (১৮২৯), ঠগি দমন (১৮২৬-৩৫), মহীশূর রাজ্য ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনস্থ হয় (১৮৩১-১৮৮১)
  11. লর্ড অকল্যাণ্ড (১৮৩৬–১৮৪২): উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ প্রতিষ্ঠিত হয় (১৮৩৬), ১৮৩৭-৩৮ সালের আগ্রা মন্বন্তর, প্রথম ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ (১৮৩৯-১৮৪২), এলফিনস্টোন বাহিনী গণহত্যা (১৮৪২)
  12. লর্ড এলেনবরো (১৮৪২–১৮৪৪): প্রথম ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ (১৮৩৯-১৮৪২), সিন্ধ অধিগ্রহণ (১৮৪৩), ব্রিটিশ ভারতে দাসপ্রথা বিলোপ (১৮৪৩)
  13. হেনরি হার্ডিঞ্জ (১৮৪৪–১৮৪৮): ১ম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধ (১৮৪৫-৪৬), লাহোর চুক্তি (১৮৪৬) অনুযায়ী শিখেরা জলন্ধর দোয়াব, হাজারা ও কাশ্মীর ব্রিটিশদের দেয়, অমৃতসর চুক্তি (১৮৪৬) অনুযায়ী কাশ্মীর জম্মুর রাজা গুলাব সিংকে দেয়া হয়।
  14. মার্কুইস অফ ডালহৌসি (১৮৪৮–১৮৫৬): ২য় ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধ (১৮৪৮-৪৯), পাঞ্জাব অধিগ্রহণ (১৮৪৯), রেলের নির্মাণ সূচনা (১৮৫০), টেলিগ্রাফ লাইন স্থাপন (১৮৫১), ২য় ইঙ্গ-ব্রহ্ম যুদ্ধ (১৮৫২-৫৩), গঙ্গা খাল চালু (১৮৫৪), স্বত্ববিলোপ নীতি
  15. চার্লস ক্যানিং (১৮৫৬–১৮৫৮): বিধবাবিবাহ আইন (২৫ জুলাই, ১৮৫৬), প্রথম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় (১৮৫৭), ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ (১০ মে, ১৮৫৭–২০ জুন, ১৮৫৮), ভারত শাসন আইন ১৮৫৮ অনুযায়ী ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনবিলোপ

১৮৫৭ সালে সমগ্র ভারতবর্ষে অভূতপূর্ব সিপাহী বিদ্রোহ (Sepoy Rebellion/ Sepoy Mutiny ) শুরু হয় ইতিহাসে যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম ঐক্যবদ্ধ স্বাধীনতা আন্দোলন নামে অভিহিত হয়। সিপাহী বিদ্রোহ একটি বিক্ষুব্ধ প্রতিরোধ প্রয়াস হলেও তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিপাহী ও রাজন্যবর্গের মধ্যে সীমিত ছিল। যুদ্ধ ভারতবর্ষের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লেও স্থানভেদে যুদ্ধের প্রকৃতি, বিস্তৃতি ও জনগনের ভুমিকা ভিন্ন ছিল। যুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে এনফিল্ড রাইফেলের টোটায় ‘গরু ও শূকরের চর্বি মিশ্রণের’ কাহিনী মুখ্য ভূমিকা রাখলেও এর সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও সামরিক কারণ ছিল।

সিপাহী বিদ্রোহ

ব্যারাকপুর থেকে মীরাট (১০ মে, ১৮৫৮) এবং সেখান থেকে দিল্লিতে (১১ মে, ১৮৫৮) বিস্তার লাভ করে। বিদ্রোহী সিপাহীরা ১১ মে দিল্লীর লালকেল্লা দখল করে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে হিন্দুস্তানের সম্রাট বলে ঘোষণা করে। মীরাট ও দিল্লিতে সিপাহীরা ব্রিটিশ অফিসারদের হত্যা করে। ক্রমে এ বিদ্রোহ দ্রূত গতিতে ফিরোজপুর, মুজাফফরনগর, পাঞ্জাব, নৌসেরা, হতমর্দান, অযোধ্যা, মথুরা, রুরকী, লক্ষ্ণৌ, বেরিলী, শাহজাহানপুর, মোরাদাবাদ, আজমপুর, কানপুর, এলাহাবাদ, ফৈজাবাদ, ফতেহপুর, ফতেহগড় ও অন্যান্য বহু স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। একক কোনো নেতৃত্বে এই বিদ্রোহ পরিচালিত না হলেও, কানপুরের নানা সাহেব, তাঁতিয়া তোপী, মঙ্গল পাণ্ডে, আজিমউল্লাহ, ভগত সিং ও ঝাঁসির রানী লক্ষ্ণী বাঈ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৮৫৭ সালে ২১ সেপ্টেম্বর ইংরেজ বাহিনী দিল্লী দখল করে সম্রাটকে সপরিবারে বন্দি করে এবং তাঁর দুই পুত্র ও এক পৌত্রকে বিনা বিচারে হত্যা করে। ১৮৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে বৃদ্ধ সম্রাটকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয় এবং সেখানেই ১৮৬২ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। ইংরেজরা এই অভূতপূর্ব বিদ্রোহকে নৃশংস, বর্বর ও নির্দয়ভাবে দমন করে। দেশীয় সৈন্যদের কোনো একক নেতৃত্ব না থাকা, ব্রিটিশ বাহিনির দক্ষ ও চৌকসভাবে যুদ্ধ পরিচালনা, স্থানীয় জমিদারদের ব্রিটিশসাম্রাজ্যের পক্ষ অবলম্বন, শিখ ও নেপালি সৈন্যদের সমর্থন দান প্রভৃতিকে মূলত এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হবার কারণ বলে মনে করা হয়। বিদ্রোহ দমন হওয়ার পর, মহারাণী ভিক্টোরিয়া ১ নভেম্বর, ১৮৫৮ সালে এক ঘোষণা বলে ভারত শাসন বিধি ১৮৫৮ (India Act of 1858) জারি করেন। এর ফলে ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন অবসান ঘটে এবং ব্রিটিশ রাজের প্রত্যক্ষ শাসন শুরু হয়। লর্ড ক্যানিংকে ভারতের প্রথম ভাইসরয় ঘোষণা করা হয় এবং ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার একজন সদস্যকে ভারত সচিব করা হয়।

ক্যানিং ১৮৫৯ সালে লর্ড ডালহৌসি কর্তৃক প্রণিত স্বত্ব-বিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse) বিলুপ্ত করেন। তিনি ১৮৫৮ সালে ভারতীয় ফৌজদারি বিধি (Indian Penal Code 1858) ও ১৮৫৯ সালে Code of Criminal Procedure (CrPC 1859) প্রণয়ন করেন। ১৮৬১ সালে তিনি Indian Council Act, 1861 ও Indian High Courts Act, 1861 প্রণয়ন করেন। তাঁর শাসন আমলে ১৮৫৯-৬০ সালে বাংলায় নীল বিদ্রোহ দেখা দেয়।

  1. লর্ড এলগিন (১৮৬২-৬৩)
  2. লর্ড জন লরেন্স (১৮৬৪-৬৯): তিনি ১৯৬৮ সালে পাঞ্জাব প্রজাস্বত্ব আইন ও অযোধ্যা প্রজাস্বত্ব আইন পাস করেন। তার সময়ে উড়িষ্যায় এক মারাত্নক দুর্ভিক্ষের (১৮৬৫-৬৬) ফলে প্রায় দশ লক্ষ লোক মারা যায়।
  3. লর্ড মেয়ো (১৮৬৯-৭২): ভারতীয় প্রজাদের করভারে জর্জরিত করে এবং ব্যয়সঙ্কোচ নীতি গ্রহন করে রাজস্ব বৃদ্ধি করেন। তিনি আজমীরে মেয়ো কলেজ এবং লাহোর ও রাজকোটে কলেজ স্থাপন করেন। ১৮৭২ সালে লর্ড মেয়ো আন্দামানে দ্বীপান্তরদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তিদের বাসস্থান পরিদর্শনকালে জনৈক পাঠান কয়েদির আকষ্মিক ছুরিকাঘাতে মৃত্যুবরণ করেন।
  4. লর্ড নর্থব্রুক (১৮৭২-৭৬): নর্থব্রুক লাইসেন্স কর, মাদ্রাজে গৃহকর, বোম্বাইয়ের অ-কৃষি কর এবং মধ্য প্রদেশের পাণ্ডারি কর লোপ করেন। বৃটিশ মন্ত্রিসভা, বিশেষকরে তৎকালীন ভারত সচিব জর্জ ক্যাম্পবেল, ডিউক অব আরগিলের সাথে মতানৈক্যের কারনে ১৮৭৬ সালে ভাইসরয়ের পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
  5. লর্ড লিটন (Lord Lytton) (১৮৭৬-৮০)
  6. লর্ড রিপন (Lord Rippon) (১৮৮০-৮৪)
  7. লর্ড ডাফেরিন (Lord Dufferin) (১৮৮৪-৮৮)
  8. লর্ড ল্যান্ডসডোন (Lord Landsdowne) (১৮৮৮-৯৪)
  9. লর্ড এলগিন-২ (Lord Elgin-II) (১৮৯৪-১৮৯৯)
  10. লর্ড কার্জন (Lord Curzon) (১৮৯৯-১৯০৫)
  11. লর্ড মিন্টো-২ (Lord Minto II) (১৯০৫-১৯১০)
  12. লর্ড হার্ডিং-২ (Lord Hardinge II) (১৯১০-১৬)
  13. লর্ড চেমসফোর্ড (Lord Chelmsford) (১৯১৬-২১)
  14. লর্ড রিডিং (Lord Reading) (১৯২১-২৬)
  15. লর্ড আরউইন (Lord Irwin) (১৯২৬-৩১)
  16. লর্ড উইলিংডন (Lord Willingdon) (১৯৩১-৩৬)
  17. লর্ড লিনলিথগো (Lord Linlithgow) (১৯৩৬-৪৩)
  18. লর্ড ওয়াভেল (Lord Wavell) (১৯৪৩-৪৭)

CHAPTER 8 দেশ বিভাজন

দীর্ঘ ১৯০ বছর (১৭৫৭) ব্রিটিশদের গোলামীর পর ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দ্বি-জাতি তত্বের ভিত্তিতে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভাজন হয়ে জন্ম হয় ভারত ও পাকিস্থান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের। ক্লিপটনের সীমান্ত নির্ণয়ে তৈরি হলো ভারত ও পাকিস্থানের বির্তকিত ভূখন্ড। হিন্দু-মুসলিম চলমান দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলেই এই দেশ বিভাজন।

  • ১৯৪৮
    যেই বাংলার মানুষের ভোটে পাকিস্তান আসল, স্বাধীনতার আট মাসেও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তার ৫৫% জনগনের কোন খোঁজই রাখলেন না। যখন আট মাস পরে তাঁর সময় হল ঢাকায় পদধুলি দেবার, তিনি বললেন – “উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা”। রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনের শুরু।
  • ১৯৪৯
    ঢাকায় মুসলিম লীগের সোহরোওয়ারদি গ্রুপের “পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম” গঠন। মুল সংগঠক মাওলানা আব্দুল খান ভাসানি, টাঙ্গাইলের শামসুল হক এবং (পুরান) ঢাকার ইয়ার মোহাম্মদ খান।
  • ১৯৫১
    সোহরাওয়ারদির নেতৃত্বে “নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম” গঠন।
  • ১৯৫২
    ভাষা আন্দোলন।
  • ১৯৫৩
    পূর্ব বাংলার “Advocate General” এর পদ থেকে শের এ বাংলা এ কে ফজলুল হকের ইস্তফা। নতুন দল গঠন – নাম “কৃষক শ্রমিক পার্টি” (K.S.P.)।
  • ১৯৫৪
    ঐতিহাসিক নির্বাচন। হক-ভাসানি – সোহরোওয়ারদি গঠন করলেন “যুক্ত ফ্রন্ট” – মুসলিম লীগের ভরাডুবি। ২৩৭ টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩ আসনে জয়লাভ করে। মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯ টি আসন। চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী (সাকাচৌ এর পিতা) মুসলিম লীগে যোগদান করে তাদের আসন সংখ্যা ১০ এ উন্নীত করেন। শের এ বাংলা এ কে ফজলুল হক পূর্ব বাংলার মুখ্য মন্ত্রী।
  • ১৯৫৪-৫৮
    অকথিত চার বছর। বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে যারা কথা বলেন, তাঁরা এই চার বছরের কথা সাবধানে এড়িয়ে যান। একদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, অপরদিকে পূর্ব পাকিস্তানের নেতৃত্বের কোন্দল – সব মিলিয়ে জটিল অবস্থা। আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে। ১৯৫৮ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে বিরোধী দলীয় সদস্যদের আক্রমণ/মারামারি – ফলশ্রুতিতে আওয়ামী লীগ দলীয় সাংসদ ও ডেপুটি স্পীকার শাহেদ আলীর মৃত্যু। পাকিস্তানীরা ঠিক এই সুযোগটিই খুঁজছিল। অবশেষে সামরিক শাসন। প্রথমে জেনারেল (অবঃ) ইস্কান্দার মীর্জা ও পরে আইয়ুব খান পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কারাগারে বন্দী।
  • ১৯৬২
    শের এ বাংলা এ কে ফজলুল হকের মৃত্যু। “শরীফ শিক্ষা কমিশনের” বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন।
  • ১৯৬৩
    বৈরুতে হোসেন শহীদ সোহরোওয়ারদির রহস্যজনক মৃত্যু।
  • ১৯৬৫
    প্রেসিডেন্ট “নির্বাচনে” মিসেস ফাতেমা জিন্নাহকে পরাজিত করে আইয়ুব খান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত।
  • ১৯৬৫
    পাক ভারত যুদ্ধ। পূর্ব পাকিস্তান অরক্ষিত। তাসখন্দ চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি। আইয়ুব খানের রাজনৈতিক পরাজয়।
  • ১৯৬৬
    আইয়ুব খান “তাসখন্দ চুক্তি” জায়েজ করার জন্য এক গোল টেবিল বৈঠক ডাকলেন। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের “ছয় দফা” প্রস্তাব উত্থাপন। গোল টেবিল বৈঠক ব্যার্থ। আইয়ুব খানের চোখ রাঙ্গানি – “অস্ত্রের ভাষায় ছয় দফার জবাব দেওয়া হবে”।
  • ১৯৬৬-৬৭
    ছয় দফা পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক জনপ্রিয়। শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার।
  • ১৯৬৭-৬৮
    পাকিস্তান সরকারের মামলা – “State vs. Sheikh Mujibur Rahman and others” বা“আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা”। অভিযোগ – পূর্ব পাকিস্তানের কিছু সামরিক সদস্য ও রাজনিতিবিদ ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা ও বিভিন্নস্থানে গোপন বৈঠক করেছেন “বাংলাদেশ” নামের এক দেশ প্রতিষ্ঠার জন্য। প্রায় পনেরশত গ্রেপ্তার।
  • ১৯৬৮-৬৯
    মাওলানা ভাসানির নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক আন্দোলন।

১৯৬৯ সালের ২০শে জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে ছাত্র নেতা আসাদের মৃত্যু (পুরো নাম – আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান)। ১৫-ই ফেব্রুয়ারি এই মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হক এক পাকিস্তানী হাবিলদারেরে গুলিতে বন্দী অবস্থায় নিহত। পূর্ব পাকিস্তান উত্তাল। অবশেষে ২২শে বেব্রুয়ারি মামলা প্রত্যাহার। ২৩ তারিখে এক বিশাল জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধি প্রদান। Time Magazine-এ আইয়ুব পতনের কৃতিত্ব দিয়ে মাওলানা ভাসানিকে নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন – তাঁকে উপাধি দেওয়া হল “ Prophet of Violence”। আইয়ুবের পতন – ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা নিলেন।

১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া খান অবশেষে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথমবারের মত দেশ ব্যাপী নির্বাচন দিলেন – “এক মাথা এক ভোট”। পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। দলটি পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ টি আসন হতে ১৬৭ টি আসনে জয়লাভ করে এবং ৩১৩ আসনবিশিষ্ট জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, যা আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের অধিকার প্রদান করে। কিন্তু নির্বাচনে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিরোধিতা করেন। তিনি প্রস্তাব করেন পাকিস্তানের দুই প্রদেশের জন্যে থাকবে দু’জন প্রধানমন্ত্রী। “এক ইউনিট কাঠামো” নিয়ে ক্ষুব্ধ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে এরূপ অভিনব প্রস্তাব নতুন করে ক্ষোভের সঞ্চার করে। ভুট্টো মুজিবের ৬-দফা দাবি মেনে নিতেও অস্বীকৃতি প্রকাশ করেন।

CHAPTER 9 স্বাধীনতা যুদ্ধঃ বাংলাদেশ এর সূচনা

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা হয় কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমা (বর্তমানে জেলা) বৈদ্যনাথতলার অন্তর্গত ভবেরপাড়া (বর্তমান মুজিবনগর) গ্রামে। শেখ মুজিবুর রহমান এর অনুপস্থিতিতে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করে সরকার গঠন করা হয়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব অর্পিত হয় তাজউদ্দিন আহমদের উপর। বাংলাদেশের প্রথম সরকার দেশি-বিদেশি সাংবাদিকের সামনে শপথ গ্রহণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পালন শুরু করে। এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠের মাধ্যমে ২৬ মার্চ হতে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করা হয়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইট আরম্ভ করে যার উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেয়া। এরই অংশ হিসাবে সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের নিরস্ত্র করে হত্যা করা হয়, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদের নিধন করা হয় এবং সারা বাংলাদেশে নির্বিচারে সাধারণ মানুষ হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের খবর যাতে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে না পৌঁছায় সে লক্ষ্যে ২৫ মার্চের আগেই বিদেশি সাংবাদিকদের ঢাকা পরিত্যাগে বাধ্য করা হয়। তারপরও সাংবাদিক সাইমন ড্রিং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকায় অবস্থান করে ওয়াশিংটন পোস্টের মাধ্যমে সারা পৃথিবীকে এই গণহত্যার খবর জানিয়েছিলেন। যদিও এই হত্যাযজ্ঞের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা, বাঙালি হত্যা পুরো দেশজুড়ে চালানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো ছিল তাদের বিশেষ লক্ষ্য। একমাত্র হিন্দু আবাসিক হল – জগন্নাথ হল – পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। এতে ৬০০ থেকে ৭০০ আবাসিক ছাত্র নিহত হয়। যদিও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ডের কথা অস্বীকার করেছে, তবে হামিদুর রহমান কমিশনের মতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করেছিলো। জগন্নাথ হল এবং অন্যান্য ছাত্র হলগুলোতে পাকিস্তানিদের হত্যাযজ্ঞের চিত্র ভিডিওটেপে ধারণ করেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি (বর্তমান বুয়েট) এর প্রফেসর নূরুল উলা।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হয়।

১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডোরা অপারেশন জ্যাকপটের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙ্গর করে থাকা পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজগুলো মাইন দিয়ে ধ্বংস করে দেয়।

১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর বিকেল পাঁচটায় রেডিও পাকিস্তান সংক্ষিপ্ত এক বিশেষ সংবাদ প্রচার করে যে “ভারত পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্তজুড়ে আক্রমণ শুরু করেছে। বিস্তারিত খবর এখনো আসছে।” পাঁচটা ৯ মিনিটে পেশোয়ার বিমানবন্দর থেকে ১২টি যুদ্ধবিমান উড়ে যায় কাশ্মীরের শ্রীনগর ও অনন্তপুরের উদ্দেশ্যে এবং সারগোদা বিমানঘাঁটি থেকে আটটি মিরেজ বিমান উড়ে যায় অমৃতসর ও পাঠানকোটের দিকে। দুটি যুদ্ধবিমান বিশেষভাবে প্রেরিত হয় ভারতীয় ভূখণ্ডের গভীরে আগ্রায় আঘাত করার উদ্দেশ্যে। মোট ৩২টি যুদ্ধবিমান অংশ নেয় এই আক্রমণে। মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠকের পর মধ্যরাত্রির কিছু পরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বেতার বক্তৃতায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে বলেন, এতদিন ধরে “বাংলাদেশে যে যুদ্ধ চলে আসছিল তা ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।” আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণার মাত্র ১৩ দিনের মাথায় যৌথবাহিনী ঢাকার দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। এর আগেই বিমান হামলা চালিয়ে পাকিস্তানি বিমানবাহিনীকে পরাস্ত করে ঢাকার সকল সামরিক বিমান ঘাঁটির রানওয়ে বিধ্বস্ত করে দেয়া হয়। তৎকালীন পাকিস্তানি উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আশ্বাস পেয়েছিলেন উত্তরে চীন ও দক্ষিণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাঁদের জন্য সহায়তা আসবে, কিন্তু বাস্তবে তার দেখা মেলেনি।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারা ৯৩,০০০ হাজার সৈন্যসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। এরই মাধ্যমে নয় মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের অবসান ঘটে; প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালি জাতির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ।